আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংজ্ঞা, ইহার পরিধি ও বিষয়বস্তু /বৈশিষ্ট্য
আন্তর্জাতিকতার এই যুগে মানুষের জীবনযাত্রার মান জাতীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দেশসমূহ আজ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পরস্পর পরস্পর কর্তৃক প্রভাবিত। তাই অন্য দেশের তথ্যাদি জানার জন্য আন্তর্জাতিক রাজনীতির সৃষ্টি হয়েছে আজ বিশ্ব সমাজে। এখন প্রশ্ন হল –
আন্তর্জাতিক রাজনীতি কী?
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বলতে কী বুঝায় তা এক কথায় বলা সহজসাধ্য নয়। বিভিন্ন রাজনীতিবিদ বিভিন্নভাবে এর সংজ্ঞা প্রদানের চেষ্টা করেছেন। জন হ্য্যালেসিয়ারের মতে “International politics describes official political relations between governments acting on behalf of their States”. অধ্যাপক প্যাডেল ফোর্ড বলেন “International politics is the interaction of state policies.” তিনি আরো বলেন যে, বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারের মধ্যে আদান-প্রদানের সম্পর্কই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বা রাজনীতির ভিত্তি বা বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে। গ্রেসন কার্ক বলেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বলতে আমরা সেই শাস্ত্রকে বুঝি যা বিভিন্ন জাতীয় রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি এবং সেই সঙ্গে এ সমস্ত নীতির কার্যকারিতা ও প্রভাব নিয়ে পর্যালোচনা করে।
সুতরাং উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলি আলোচনা করে আমরা বলতে পারি জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে অপরাপর রাষ্ট্রের সাথে যেসব ব্যবহারিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক চলে তাকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি বলে। যে কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, তার জাতীয় স্বার্থ, রাজনৈতিক আদর্শ প্রভৃতির বাহ্যিক প্রতিফলন, এরূপ স্বার্থ বা আদর্শ সিদ্ধির বা রক্ষার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রবর্গের সাথে তাল মিলিয়ে চলার কার্যকলাপই হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু :
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভিন্ন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, এ ব্যাপারে সর্বজন স্বীকৃত কোন মত নেই। তবে কয়েকজন পন্ডিতের মতামতগুলি বিশ্লেষণ করলে এর পরিধি ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। জোসেফ ফ্যাঙ্কেল বলেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। তার মতে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। অধ্যাপক ফ্যাঙ্কেলের মতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পামার এবং পারকিনস বলেন যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা, জাতীয় শক্তি, কূটনীতি, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, যুদ্ধ, শক্তি সাম্য, যৌথ নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন, বৈদেশিক নীতি, জাতীয় নীতি বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক কৌশল সমূহ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচ্য সূচির অন্তর্ভুক্ত। এই সঙ্গে অধ্যাপক মর্গান্থ বলেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত: ক্ষমতা, আদর্শ, সাম্রাজ্যবাদ, শক্তিসাম্য, বিশ্বজনমত, আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সংগঠন, কূটনীতি, শান্তির সমস্যা, বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে আলোচনা করে। অধ্যাপক বাটন এখানে আরো দুটি বিষয় সংযুক্ত করেন। সেগুলি হল যৌথ নিরাপত্তা ও ঠান্ডা লড়াই। অতি সুস্পষ্টভাবে অধ্যাপক গ্রেমন কার্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতির মধ্যে পাঁচটি বিষয়ের উল্লেখ করেন।
১. রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃতি ও পরিচালনা
২ . বৃহৎ রাষ্ট্র বর্গের অবস্থান ও তাদের বৈদেশিক নীতি
৩ . রাষ্ট্রের ক্ষমতার উপর প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান সমূহ
৪. সাম্প্রতিককালের আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী এবং
৫. বিশ্ব সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা।
সামগ্রিকভাবে উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলি থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রায় সকলের মতামতের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। সকলের মতামতের সামঞ্জস্য বিধান করলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিম্নলিখিত বিষয়বস্তুগুলি দৃশ্যমান হয়।
১. জাতীয় শক্তি :
প্রত্যেকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নির্ভর করে সেদেশের জাতীয় শক্তির উপর। সুতরাং জাতীয় শক্তির বিভিন্ন দিক আলোচনা করা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।
২. সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ :
জাতীয় শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসাবেই সাম্রাজ্যবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের বিকাশ ঘটেছে। সুতরাং এই বিষয়টিও আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধির অন্তর্ভুক্ত।
৩. জাতীয়তাবাদ :
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের রুপ, উত্থান ও প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে।
৪ . শক্তিশাম্য ও যৌথ নিরাপত্তা:
সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির লড়াইয়ের ফলে জন্ম নিয়েছে শক্তিসাম্য নীতি ও যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুতরাং এই দুটি তত্ত্বের বিভিন্ন দিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার বিষয়বস্তু।
৫. কূটনীতি :
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কূটনীতিবিদের কার্যাবলী, বিভিন্ন প্রকারের কূটনীতি প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
৬. আন্তর্জাতিক আইন :
কূটনীতির প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন হয় আন্তর্জাতিক আইন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন কী ভূমিকা পালন করে এসব বিষয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধির অন্তর্ভুক্ত।
৭ . বৈদেশিক নীতি :
বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক সাধারণত, নির্ধারিত হয় বৈদেশিক নীতির মাধ্যমে। সুতরাং বৈদেশিক নীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।
৮. আন্তর্জাতিক সংগঠন :
বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ব শান্তি সংরক্ষণে জাতিসংঘের ভূমিকা আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার বিষয়বস্তু।
৯. সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী :
ইহার অন্যতম বিষয়বস্তু হলো সম্প্রতিক সময়ের ঘটে যাওয়া আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এইসব ঘটনার আলোচনা ও সমালোচনা করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গাঁজা ও ইসরাইল যুদ্ধ, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান ইসরাইল যুদ্ধ তাই এটাও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বিষয়বস্তু।
সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে পরিশেষে আমরা বলতে পারি ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনশীল বিশ্বে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। তবে সাধারণভাবে মূল বিষয়গুলির কোন পরিবর্তন হয়নি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু তাই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় শক্তি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বৈদেশিক নীতির প্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা পর্যন্ত ব্যাপৃত।
মো. মুকুল হায়দার
সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর