Categories
Honors 3rd Year Master's Preliminary

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংজ্ঞা, ইহার পরিধি ও বিষয়বস্তু /বৈশিষ্ট্য  

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংজ্ঞা, ইহার পরিধি ও বিষয়বস্তু /বৈশিষ্ট্য  

আন্তর্জাতিকতার এই যুগে মানুষের জীবনযাত্রার মান জাতীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দেশসমূহ আজ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পরস্পর পরস্পর কর্তৃক প্রভাবিত। তাই অন্য দেশের তথ্যাদি জানার জন্য আন্তর্জাতিক রাজনীতির সৃষ্টি হয়েছে আজ বিশ্ব সমাজে। এখন প্রশ্ন হল –

আন্তর্জাতিক রাজনীতি কী?

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বলতে কী বুঝায় তা এক কথায় বলা সহজসাধ্য নয়। বিভিন্ন রাজনীতিবিদ বিভিন্নভাবে এর সংজ্ঞা প্রদানের চেষ্টা করেছেন। জন হ্য্যালেসিয়ারের মতে “International politics describes official political relations between governments acting on behalf of their States”. অধ্যাপক প্যাডেল ফোর্ড বলেন “International politics is the interaction of state policies.” তিনি আরো বলেন যে, বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারের মধ্যে আদান-প্রদানের সম্পর্কই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বা রাজনীতির ভিত্তি বা বিষয়বস্তু  নির্ধারণ করে।   গ্রেসন কার্ক বলেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বলতে আমরা সেই শাস্ত্রকে বুঝি যা বিভিন্ন জাতীয় রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি এবং সেই সঙ্গে এ সমস্ত নীতির কার্যকারিতা ও প্রভাব নিয়ে পর্যালোচনা করে। 

সুতরাং উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলি আলোচনা করে আমরা বলতে পারি জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে অপরাপর রাষ্ট্রের সাথে যেসব ব্যবহারিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক চলে তাকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি বলে। যে কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, তার জাতীয় স্বার্থ, রাজনৈতিক আদর্শ প্রভৃতির বাহ্যিক প্রতিফলন, এরূপ স্বার্থ বা আদর্শ সিদ্ধির বা রক্ষার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রবর্গের সাথে তাল মিলিয়ে চলার কার্যকলাপই হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। 

আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু :

আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভিন্ন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, এ ব্যাপারে সর্বজন স্বীকৃত কোন মত নেই। তবে কয়েকজন পন্ডিতের মতামতগুলি বিশ্লেষণ করলে এর পরিধি ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। জোসেফ ফ্যাঙ্কেল বলেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। তার মতে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। অধ্যাপক ফ্যাঙ্কেলের মতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পামার এবং পারকিনস বলেন যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা, জাতীয় শক্তি, কূটনীতি, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, যুদ্ধ, শক্তি সাম্য, যৌথ নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন, বৈদেশিক নীতি, জাতীয় নীতি বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক কৌশল সমূহ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচ্য সূচির অন্তর্ভুক্ত। এই সঙ্গে অধ্যাপক মর্গান্থ বলেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত: ক্ষমতা, আদর্শ, সাম্রাজ্যবাদ, শক্তিসাম্য, বিশ্বজনমত, আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সংগঠন, কূটনীতি, শান্তির সমস্যা, বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে আলোচনা করে।  অধ্যাপক বাটন এখানে আরো দুটি বিষয়  সংযুক্ত করেন। সেগুলি হল যৌথ নিরাপত্তা ও ঠান্ডা লড়াই। অতি সুস্পষ্টভাবে অধ্যাপক গ্রেমন কার্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতির মধ্যে পাঁচটি বিষয়ের উল্লেখ করেন।

১. রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃতি ও পরিচালনা 

২ . বৃহৎ রাষ্ট্র বর্গের অবস্থান ও তাদের বৈদেশিক নীতি 

৩ . রাষ্ট্রের ক্ষমতার উপর প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান সমূহ 

৪. সাম্প্রতিককালের আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী এবং 

৫. বিশ্ব সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। 

  সামগ্রিকভাবে উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলি থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রায় সকলের মতামতের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। সকলের মতামতের সামঞ্জস্য বিধান করলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিম্নলিখিত বিষয়বস্তুগুলি দৃশ্যমান হয়। 

১. জাতীয় শক্তি :

প্রত্যেকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নির্ভর করে সেদেশের জাতীয় শক্তির উপর। সুতরাং জাতীয় শক্তির বিভিন্ন দিক আলোচনা করা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য। 

২. সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ :

জাতীয় শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসাবেই সাম্রাজ্যবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের বিকাশ ঘটেছে। সুতরাং এই বিষয়টিও আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধির  অন্তর্ভুক্ত। 

৩. জাতীয়তাবাদ :

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের রুপ, উত্থান ও প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে। 

৪ . শক্তিশাম্য ও যৌথ নিরাপত্তা:

সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির লড়াইয়ের ফলে জন্ম নিয়েছে শক্তিসাম্য নীতি ও যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুতরাং এই দুটি তত্ত্বের বিভিন্ন দিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার বিষয়বস্তু। 

৫. কূটনীতি :

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কূটনীতিবিদের কার্যাবলী, বিভিন্ন প্রকারের কূটনীতি প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। 

৬. আন্তর্জাতিক আইন :

কূটনীতির প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন হয় আন্তর্জাতিক আইন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন কী ভূমিকা পালন করে এসব বিষয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধির অন্তর্ভুক্ত। 

৭ . বৈদেশিক নীতি :

বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক সাধারণত, নির্ধারিত  হয় বৈদেশিক নীতির মাধ্যমে। সুতরাং বৈদেশিক নীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। 

৮. আন্তর্জাতিক সংগঠন :

বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ব শান্তি সংরক্ষণে জাতিসংঘের ভূমিকা আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার বিষয়বস্তু। 

৯. সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী :

ইহার অন্যতম বিষয়বস্তু হলো সম্প্রতিক সময়ের ঘটে যাওয়া আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এইসব ঘটনার আলোচনা ও সমালোচনা করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গাঁজা ও ইসরাইল যুদ্ধ, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান ইসরাইল যুদ্ধ তাই এটাও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বিষয়বস্তু।  

সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে পরিশেষে আমরা বলতে পারি ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনশীল বিশ্বে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। তবে সাধারণভাবে মূল বিষয়গুলির কোন পরিবর্তন হয়নি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু তাই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় শক্তি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বৈদেশিক নীতির প্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা পর্যন্ত ব্যাপৃত। 

মো. মুকুল হায়দার
সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

Categories
Honors 2nd Year Honors 1st Year Honors 3rd Year Honors 4th Year Master's Final Year Others

জুলাই বিপ্লব ২০২৪ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

‘জুলাই বিপ্লব’— বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এটি একটি জাতির গণজাগরণ ও সংগ্রামের মহাকাব্যিক চিত্র। বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতির রক্তাক্ত অধ্যায় ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান। এ আন্দোলন ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। শহীদদের রক্তে রাঙানো রাজপথ, সাহসী স্লোগানে মুখরিত ছাত্র-জনতা এবং এক নতুন সূর্যের প্রত্যাশা— এই বিপ্লবের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ।

‘জুলাই বিপ্লব’ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই বিপ্লবের পটভূমি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ, যা কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে উত্তপ্ত রূপ লাভ করে। পরবর্তীকালে একটি বৈষম্যবিরোধী গণজাগরণে রূপ নেয়, যা ফ্যাসিস্ট নেতৃত্বাধীন ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটায়।  ২০১৮ সালে সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দিলেও; ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে। এই রায়ের ফলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা এবং ১০ শতাংশ জেলা কোটা পুনর্বহাল হয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার করে। ফলে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠনের নেতৃত্বে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকালে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মত প্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, যা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল। এছাড়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষা ও চাকরির সংকট এবং মূল্যস্ফীতি জনগণের অসন্তোষকে আরও তীব্র করে তোলে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সরকার এটি দমন করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে। এ ঘটনার পর আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। সরকারের দমননীতি ক্রমেই গণহত্যায় রূপ নেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১,৫৮১ জন শহীদ হন, যার মধ্যে ১২৭ জন শিশু ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খসড়া তালিকায় শহীদের সংখ্যা ৮৩৪, এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ১,৪০০ পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার কারফিউ জারি করে এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, কিন্তু এটি জনরোষকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ২১ জুলাই বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করে ও সরকারি চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে। ২২ জুলাই এই বিষয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনের ফলে কোটা সংস্কার হলেও এরই ধারাবাহিকতায় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় ।

আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর এবং সেনাবাহিনীর দ্বৈত ভূমিকার মধ্যে ৫ আগস্ট ২০২৪ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এই ঘটনার পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে।

জুলাই বিপ্লব শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এটি প্রমাণ করে যে, জনগণের সম্মিলিত শক্তি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে পারে।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল বিস্তর। এই বিপ্লব থেকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল বহুমুখী এবং গভীর। জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যেখানে থাকবে আইনের শাসন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামো। জনগণ প্রত্যাশা করেছিল যে, তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে, জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠিত হবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে এই বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল সমাজে বিদ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করা। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। জনগণ আশা করেছিল যে, কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ নিশ্চিত হবে এবং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি, এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল সমাজের প্রচলিত অচলায়তন ভেঙে নতুন একটি পরিবর্তনের সূচনা করা, যেখানে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হবে এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

জনগণ প্রত্যাশা করেছিল যে, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে। এছাড়া, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সত্য প্রকাশের নিশ্চয়তা ছিল এই আন্দোলনের অন্যতম দাবি। জনগণ আশা করেছিল যে, এই শহীদদের ত্যাগ স্বীকৃত হবে এবং তাদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া, শহীদদের স্মরণে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগও জনগণের প্রত্যাশার অংশ ছিল। বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব শাসনব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছিল। আন্দোলনের ফলে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের আশা ছিল যে, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল। জুলাই বিপ্লব ছিল ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ফল। জনগণ আশা করেছিল যে, এই ঐক্য একটি সম্প্রীতিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়ক হবে, যেখানে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে কাজ করবে।

জুলাই বিপ্লব ২০২৪ থেকে প্রাপ্তি

জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান। অনিশ্চিত, ঝুঁকিপূর্ণ ও দুঃসাহসী সেই সময়ে ৫ আগস্ট ২০২৪-এ তীব্র গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। ৮ আগস্ট ২০২৪-এ নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক সংকট নিরসন এবং অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। এই সরকার দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ।

৫ অগাস্ট পরবর্তী সম্ভাব্য নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে না দেওয়াই বর্তমান সরকারের আরও একটি বড় অর্জন। এদের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ হলো, বিশৃঙ্খল ও বিধ্বস্ত ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। আওয়ামী লীগ আমলের লণ্ডভণ্ড অবস্থা সামাল দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১১টি কমিশন গঠন করেছেন। এই কমিশনগুলো ইতিমধ্যে তাদের রিপোর্ট প্রদান করেছেন। এদের রিপোর্টের ভিত্তিতে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যেটা একটি আশা জাগানিয়া ঘটনা।

১৫ জানুয়ারি ২০২৫-এ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪’-এর ৮৩৪ জন শহীদের নামের গেজেট প্রকাশ করা হয়। এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ভবন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাদের ত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখার প্রয়াস। রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ এবং ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

জুলাই বিপ্লব ছাত্র-জনতার ঐক্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে জেন-জেড প্রজন্ম এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তাদের সাহস ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়। ‘বাংলা ব্লকেড’ এবং “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার” স্লোগানগুলো জনমনে গভীর প্রভাব ফেলে। নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।

এই বিপ্লব জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এবং স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থার দাবিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। আন্দোলনের ফলে রাষ্ট্র ও সমাজে সত্য বলার নিশ্চয়তার গুরুত্ব উঠে এসেছে।

এই আন্দোলন বাংলাদেশের সামাজিক মানচিত্রে একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। তরুণ সমাজের শক্তি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের সক্ষমতা স্পষ্ট হয়েছে।

ধর্মীয় সম্প্রীতির ইতিবাচক দৃষ্টান্তও দেখা গেছে, যেখানে মাদ্রাসার ছাত্ররা দুর্বৃত্তের হাত থেকে মন্দির পাহারা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের রক্ষায় এগিয়ে এসেছে।

বিপ্লব পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলেও, আনুষ্ঠানিক ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশে বিলম্ব এবং রাজনৈতিক ঐক্যের অভাবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪-এ ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়, যদিও পরে এটি ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ নামে একটি নতুন কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হয়। এই ঘোষণাপত্রে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দিকনির্দেশনা থাকার কথা ছিল।

শিক্ষা খাতে সংস্কারের জন্য এখনো কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি, যা আন্দোলনের একটি মূল দাবি ছিল। শিক্ষা খাতের সংস্কারে কমিশন গঠন না হওয়া নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। জুলাই গণহত্যার বিচারের ধীরগতি এবং বিচার এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। শহীদ ও আহতদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, এবং অর্থ পাচারের মতো সমস্যা মোকাবিলায় এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বাঁক বদলের ঘটনা। এটি কেবল কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হয়ে একটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়, যা দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, এবং অর্থনৈতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের পথ দেখায়। জুলাই বিপ্লব, বাংলাদেশের জনগণের সাহস, ঐক্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এটি স্বৈরাচারের পতন, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, এবং জনগণের, বিশেষ করে তরুণ সমাজের, ক্ষমতাকে নতুনভাবে উন্মোচন করেছে। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বের ক্ষমতা প্রমাণ করেছে। এই বিপ্লব থেকে জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, যেখানে সকলের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। এটি যদিও অনেক প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে, তবুও একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, দুর্নীতিমুক্ত এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার পথ এখনো দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। শিক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্কার, গণহত্যার বিচার, এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ বাকি। এই আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম এবং আসন্ন নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার গুরুদায়িত্ব রয়েছে। এই বিপ্লবের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করছে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয় তার উপর; সেইসাথে জনগণের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা এবং আগামী দিনগুলোতে এর অর্জিত পরিবর্তনগুলোকে কতটা টেকসই করা যায় তার ওপর। এই বিপ্লবের ফলাফলকে টিকিয়ে রাখতে সংস্কার ও স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। এই বিপ্লব আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যা যুগ যুগ ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এক ইতিহাস হয়ে থাকবে আর শহীদদের  বিরোচিত আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যেকোনো অন্যায়, অপশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার, লড়াই করার প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। 

জুলাই বিপ্লব পিডিএফ

মো. মুকুল হায়দার

*সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর,

সহায়ক তথ্যপঞ্জি

  • আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ‘জুলাই মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০২৫
  • মো. মতিউর রহমান, ‘জুলাই বিপ্লব’ মিফতা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০২৪
  • আজাদ খান ‘ছাত্র-জনতার ২৪ এর বিপ্লব’ চারু সাহিত্য অঙ্গন, ঢাকা, ২০২৫
  • ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘সংস্কৃতি’, মে ২০২৫