Categories
All Students Honors 1st Year Master's Final Year

যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার (Federal Government)

যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার (Federal Government) 

যুক্তরাষ্ট্রের আভিধানিক অর্থ সন্ধি বা চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র বা Federation ল্যাটিন শব্দ ফোয়েডাস (Feodus)    থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর মূল অর্থ সন্ধি বা চুক্তি। এই চুক্তি বা সন্ধির বিধান অনুসারে কেউ কারও বন্টিত  ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সাধারণত : যখন কতকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল একত্রিত  হয়েএকটি  বড় রাষ্ট্র গঠন করে অথবা একটি বড় রাষ্ট্র বিভক্ত হয়ে তাদের মধ্যে ক্ষমতা  বন্টন করে তখন একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার গঠিত হয়। 

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক আলোচনার পূর্বে আমাদের জানা দরকার যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা কাকে বলে। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :-

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার প্রকৃত সংজ্ঞা নিরূপণ করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। এ ব্যাপারে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার সমূহের মধ্যে সম্পর্ক বা ক্ষমতার ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে সরকারকে এককেন্দ্রিক এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় হিসাবে ভাগ করা হয়। এককেন্দ্রিক সরকারে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অর্পিত থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার সমূহের মধ্যে শাসনতন্ত্রের বিধান অনুসারে বন্টিত থাকে। নিম্নে এই ধরনের সরকারের কিছু প্রামাণ্য সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো। 

অধ্যাপক ডাইসি যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন,    “Federation is a political contrivance intended to reconcile national unity with  the maintenance of States rights”  ইহা এমন একটি রাজনৈতিক কৌশল যেখানে জাতীয় সংহতি ও অঙ্গরাজ্যের সমন্বয় সাধন সম্ভব।

অধ্যাপক কেসি হুইয়ার ইহার প্রামানিক সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেন,  “By the Federal principle I mean the method of dividing powers, so that the general and regional governments are each, within a sphere co-ordinate  and independent”  যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতি ক্ষমতা বণ্টনের একটি পদ্ধতি যেখানে সাধারণ বা কেন্দ্রীয় সরকার ও আঞ্চলিক সরকার সমূহের প্রত্যেকেই নিজ নিজ আওতার মধ্যে স্বাধীন। 

অধ্যাপক ফাইনার বলেন,   “Federal state is one which is part of the authority and powers vested in a Central institution deliberately  constituted by an association of Local areas”

সি এফ স্ট্রং  বলেন, “A federal constitution attempts to reconcile the apparently irreconcilable claims of national sovereignty and state sovereignty” 

   উপরে বর্ণিত সংজ্ঞাগুলোর প্রত্যেকটির মধ্যেই কিছুটা অসম্পূর্ণতা পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানে বার্চ  প্রদত্ত সংজ্ঞাটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা বলতে এমন একটি শাসন ব্যবস্থা বোঝায় যেখানে একটি সাধারণ সরকার ও কতকগুলি আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে এরূপভাবে ক্ষমতা বন্টিত  হয় যে, তারা  প্রত্যেকে স্ব স্ব এলাকায় একে অপরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে এবং তাদের প্রত্যেকে শাসন বিভাগীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে জনগণকে শাসন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রে এই ধরনের শাসনব্যবস্থা রয়েছে। 

সুতরাং পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হয় কয়েকটি আঞ্চলিক সরকারের সমবায়ে এবং তারা পরস্পরের সাথে স্বার্থ সম্বন্ধে এমনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয় যে, সার্বিক স্বার্থে দেশের সার্বভৌমিকতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর হয়, কিন্তু তাদের আঞ্চলিক স্বার্থ, স্বতন্ত্র সত্তা এবং সম্পদ সমূহও বিসর্জন দেয় না। 

যুক্তরাষ্ট্র ও রাষ্ট্র সমবায়ের মধ্যে পার্থক্য :

যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে আলোচনার সুবিধার জন্য সমবায় সম্পর্কে আলোচনা করা উচিত বলে  মনে করি। কতকগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র নিজেদেরকে আর্থিক উন্নতি ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা সুদৃঢ়করণ বা অন্য কোন  স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কতকগুলি নিয়ম নীতির উপর ভিত্তি করে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানের  জন্য যদি চুক্তিবদ্ধ হয় তখন রাষ্ট্র সমবায় গঠিত হয়। এ প্রসঙ্গে হল বলেন, “ইহা হচ্ছে এমন কতিপয় রাষ্ট্রের সমবায় যারা স্বেচ্ছায় কতিপয় বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নিজেদের স্বাধীনতার কিছু অংশ চিরকালের জন্য ত্যাগ করে।” তবে এ বন্ধুত্বের জন্য পরস্পরের মাঝে যে সংগঠন তা শুধু নেহায়েত আন্তরিকতা বৃদ্ধি নয় -তার সাথে সাথে অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধারও নিশ্চয়তা দান করে। তবে রাষ্ট্র সমবায় নতুন কোন স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় না। যুক্তরাষ্ট্র অপেক্ষা রাষ্ট্র সমবায় অনেক বেশি নমনীয় [flexible ]. সমবায় রাষ্ট্রগুলো ইচ্ছা করলে যেকোনো সময় সমবায় থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। ১৮১৫-১৮৬৭সালের জার্মান রাষ্ট্র ১৯০৭-১৯১৮ সালের মধ্যে আমেরিকার ফেডারেশন সাম্প্রতিক কালের উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি ASEAN, SAARC, NATO  প্রভৃতি রাষ্ট্র সমবায়ের উদাহরণ। অনেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র সমবায়কে একই অর্থে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তা নয়। 

১. সার্বভৌমত্ব : 

যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্র গুলির সার্বভৌমত্ব থাকেনা। মূল রাষ্ট্রগুলো  যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় নিজেদের সার্বভৌম সত্তা সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্র শাসনতন্ত্রের কাছে সমর্পণ করে। কিন্তু রাষ্ট্র সমবায়ের সদস্য রাষ্ট্রগুলি  সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন এবং সার্বভৌম। যেকোনো সময়েই ইহারা রাষ্ট্র সমবায়ের সদস্য পদ বাতিল করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে গেলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব থাকেনা। কিন্তু রাষ্ট্র সমবায় ভেঙে গেলে নিজ নিজ সরকারের সার্বভৌমত্ব  নষ্ট হয় না।

২. রাষ্ট্র সংগঠন : 

যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হওয়ার ফলে একটি নতুন জাতি এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। কিন্তু রাষ্ট্র সমবায় প্রতিষ্ঠার ফলে এরূপ কোন নতুন জাতি বানতুন রাষ্ট্রের  উদ্ভব  হয় না। কারণ সকল সদস্য রাষ্ট্রগুলিই আলাদা সার্বভৌমত্বের অধিকারী। তাই নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রশ্নই  আসেনা। যুক্তরাষ্ট্র শুধু নতুন রাষ্ট্র নয় ইহা নতুন জাতির জন্ম দেয়। রাষ্ট্র সমবায় তা দেয় না। রাষ্ট্র সমবায়ের যতগুলি সদস্য রাষ্ট্র ততগুলি  জাতি। 

৩. যুক্তরাষ্ট্র :

যুক্তরাষ্ট্র কিছু জনগণের  সম্মেলন, কিন্তু রাষ্ট্র সমবায় কতিপয় রাষ্ট্রের মিলন। যুক্তরাষ্ট্রে মিলন হয় স্থায়ী, কিন্তু রাষ্ট্র সমবায়ে তা অস্থায়ী। 

৪. রাষ্ট্র সমবায়ের কোন নির্দিষ্ট ভূ-ভাগ বা বিচার  ব্যবস্থা নাই:

যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট ভূ-ভাগ,  নির্দিষ্ট জনসমষ্টি এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থা থাকে। রাষ্ট্র সমবায়ের কোন নির্দিষ্ট ভূ-ভাগ অথবা জনসমষ্টি নাই এবং ইহার এমন কোন বিচার ব্যবস্থা নাই যা অঙ্গরাজ্য গুলির শাসন ব্যবস্থার  যুক্ত থাকতে পারে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে যেমন কেন্দ্রীয় সরকার প্রণীত আইন সমগ্র দেশের প্রতি প্রযোজ্য হয়, রাষ্ট্র সমবায়ের কেন্দ্রীয় পরিষদের এই রকম আইন  প্রণয়ন করার কোন ক্ষমতা নেই। ইহার  শুধু সদস্য রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে কতিপয় সাধারণ নীতিনির্ধারণ করবার ক্ষমতা আছে এবং সেগুলির অস্তিত্বও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অনুমোদনের উপর নির্ভর করে।  

৫. সংবিধানের প্রাধান্যঃ

যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের প্রাধান্য থাকার ফলে সংবিধানের অভিভাবক ও ব্যাখ্যা কর্তা হিসেবে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু রাষ্ট্র সমবায় সংবিধানের প্রাধান্য না থাকায় কোন শক্তিশালী বিচার বিভাগের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকার সমূহের মধ্যে সংবেদনের ধারা মোতাবেক ক্ষমতা বন্টিত হয়।  তাই বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র একটি সাংবিধানিক চুক্তির ফল। কিন্তু রাষ্ট্র সমবায় গঠিত হয় আন্তর্জাতিক সন্ধির  [Treaty] শর্ত অনুসারে।

৬. নাগরিকতাঃ

 যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকগণ দ্বৈত নাগরিকতার অধিকারী। একদিকে তারা কেন্দ্রীয় সরকার এবং অন্যদিকে প্রাদেশিক সরকারের নাগরিক। রাষ্ট্র সমবায়ের নাগরিকগণ শুধু  নিজ নিজ দেশের নাগরিক মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে দেশের নাগরিকদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র সমাবেশের সাথে তা থাকেনা। সদস্য রাষ্ট্রগুলির নাগরিকরাই রাষ্ট্র সমবায়ের নাগরিক।

৭. স্বার্থঃ

 যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হয় বিভিন্ন স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য। কিন্তু কতিপয় সার্থ সংরক্ষণের জন্য গঠিত হয় রাষ্ট্র সমবায়। স্বার্থ অর্জিত হবার পরও  যুক্তরাষ্ট্র টিকে থাকে কিন্তু রাষ্ট্র সমবায় ভেঙে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে দেওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্র একটি স্থায়ী মিলন, কিন্তু রাষ্ট্র সমবায় অস্থায়ী। রাষ্ট্র সমবায়ের সদস্য থাকতে ইচ্ছুক না হলে তাকে রাখা যায় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তা সহজে মান্য করা হয় না। প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলেই সদস্য রাষ্ট্রগুলি নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্র সমবায় হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জার্মান ভাষায় যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে সম্মিলিত রাষ্ট্র অথবা Bundestaat এবং রাষ্ট্র সমবায় হচ্ছে রাষ্ট্রের  সম্মিলন অথবা Staatenbund.

৮. সিদ্ধান্তগ্রহণঃ  

যুক্তরাষ্ট্রে  সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা। কিন্তু রাষ্ট্র সমবায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতির উপর ভিত্তি করে ।

যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের বৈশিষ্ট্যঃ

১. দুই ধরনের সরকার ব্যবস্থাঃ যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় দুই ধরনের সরকার বর্তমান থাকে। একটি কেন্দ্রীয় সরকার এবং অপরটি প্রাদেশিক সরকার। উভয়  সরকারই শাসনতন্ত্র হতে তাদের ক্ষমতা লাভ করে থাকে এবং উভয়েরই কাজের পরিধি শাসনতন্ত্র কর্তৃক নির্ধারিত হয়। কোন সরকার কোন সরকারের বরাদ্দকৃত ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করতে পারেনা। জনগণকে উভয়বিধ সরকারের আদেশ নির্দেশ মান্য করতে হয়। দুটি বিপরীতমুখী মনোভাবের সমন্বয় সাধনের জন্য দুই শ্রেণীর সরকারের উদ্ভব হয়েছে। একটি হলো জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মনোভাব এবং অন্যটি হলো অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির স্বাতন্ত্র ও অস্তিত্ব 

রক্ষা করা। 

২. সংবিধানের প্রাধান্য : কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে শাসনতন্ত্রের বিধান অনুসারে ক্ষমতাবন্টিত হয়। সেজন্য সংবিধানের প্রাধান্য থাকা একান্ত আবশ্যক। সংবিধানের প্রাধান্য রক্ষিত না হলে যুক্তরাষ্ট্র গঠন ও স্থায়ী হওয়া অসম্ভব। সংবিধানের প্রাধান্য রক্ষার জন্য সংবিধান লিখিত হওয়া আবশ্যক। ডাইসির মতে – “The constitution must almost necessarily be a written constitution”. ১৮৬৯ সালে একটি মামলার রায় প্রদান করতে গিয়ে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে যে “কেউ সংবিধানের  ধারা বহির্ভূত কিছু করতে পারবে না”।

৩. লিখিত এবং অনমনীয় শাসনতন্ত্র : যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র লিখিত এবং অনমনীয় থাকে। শুধু তাই নয় যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় শাসনতন্ত্রের প্রাধান্যই বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র অনমনীয় থেকে যাতে কেন্দ্রীয় সরকার অথবা কোন মূল রাষ্ট্র নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী সহজে শাসনতন্ত্রের পরিবর্তন করে নিজের কর্ম পরিধির পরিবর্তন করতে না পারে। এ প্রসঙ্গে ডাইসি বলেন,   “The law of the constitution must either be immutable or else capable of being changed only by some authority above and  beyond”.

৪. বিচার বিভাগের প্রাধান্য :যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুক্তরাষ্ট্র আদালত থাকে। অবশ্য আঞ্চলিক সরকার গুলিরও আলাদা আদালত থাকে। কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে শাসনতন্ত্রের বিধান অনুসারে ক্ষমতা বন্টিত থাকে। কিন্তু কেউ যদি শাসনতন্ত্রের বিধান লংঘন করে তাহলে  সুপ্রিম কোর্ট সে বিষয়ে  পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রায় ঘোষণা করতে পারে। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের রাই হবে চূড়ান্ত। আমেরিকার সংবিধানে উল্লেখ আছে যে, “কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকার সমূহের বিবাদ যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালতে মীমাংসিত হবে”। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের রক্ষক  হিসাবে  পরিচিতি লাভ করেছে। 

৫. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা : যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দুই কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা আবশ্যক। প্রথম কক্ষ জনসাধারণের এবং দ্বিতীয় কক্ষ অঙ্গরাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব করে। অঙ্গরাজ্য গুলির মধ্যে সমতা আনায়নের জন্য ইহা আবশ্যক। 

৬. দ্বিবিধ ব্যয় : প্রশাসন পরিচালনার ব্যয় সংকুলানের জন্য উভয়বিধ সরকারের মধ্যে আয়ের খাত বন্টন করা হয়, অন্যথায় স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রক্ষিত হয় না। এসব ক্ষেত্রে ব্যয়ের বিষয়েও নিজ নিজ সরকারের কর্তৃত্বাধীনে থাকে।

৭. আনুগত্যতা : যুক্তরাষ্ট্র গঠনের জন্য আনুগত্যতা প্রয়োজন। ইহা যুক্তরাষ্ট্রীয় মনোভাব নামে পরিচিত। আনুগত্যতা যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। 

৮. সমমর্যাদা : সমমর্যাদা যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যুক্তরাষ্ট্রীয় অঙ্গসমূহ বা অঙ্গ রাষ্ট্র সমূহের মধ্যে সম মর্যাদা থাকে। অর্থাৎ প্রত্যেক অঙ্গ রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকগণ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সমর্যাদা ও অধিকার পেয়ে থাকে। বৈরী মনোভাব পোষন করা যায় না। 

৯. ক্ষমতা বন্টন: কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার সমূহের মধ্যে বিধি মত ক্ষমতা বন্টিত হয়। তবে জাতীয় স্বার্থের প্রতি নজর রাখা হয়। সেজন্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি যেমন দেশ রক্ষা, বৈদেশিক নীতি, মুদ্রা ব্যবস্থা প্রভৃতি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অর্পিত হয় এবং আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি প্রাদেশিক সরকারের উপর অর্পিত থাকে।

১০. স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন : যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীনে কিন্তু এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে ইহা কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক পরিচালিত হয়। ফ্রান্সে স্থানীয় সরকারগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের আদেশ অনুসারে পরিচালিত হয়।

 যুক্তরাষ্ট্রের উপর্যুক্ত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছাড়াও আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়,  সেগুলো হলো – এরূপ শাসনব্যবস্থায় নানা বৈপরীত্যের মাঝে একতা লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও আরো একটি বৈশিষ্ট্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের অধিবাসীগণ এক জায়গায় বসবাস করবে কিন্তু মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে না। তারা ভৌগোলিক দিক দিয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে তবু তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। 

যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের সমস্যাবলি: 

বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা একটি  সর্বজন গ্রাহ্য শাসন ব্যবস্থা হলেও এর কিছু সমস্যাও আছে। নিম্নে সমস্যাগুলি তুলে ধরা হলো। 

১. মূল রাষ্ট্রগুলি অনেকক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারকে বিব্রত করে: শাসন ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকার এবং আঞ্চলিক সরকারগুলির মধ্যে বন্টিত হওয়ায় অঙ্গরাজ্যগুলি প্রায়ই তাহাদের সম্পত্তির অধিকারের দাবিতে নিজেদের সন্ধি-শর্তাদি কার্যকর করার জন্য জাতীয় সরকারকে বিব্রত করতে পারে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের সমস্যা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় যে রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করে, কোন অঙ্গ রাষ্ট্রে যদি সেই দল সরকার গঠন না করে, তবে উভয় সরকারের মধ্যে প্রতি পদে পদে মতভেদের আশঙ্কা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার মধ্যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব সব সময় লেগে থাকে। অনেক সময় ক্ষমতার ভারসাম্যতা রক্ষা  করা কঠিন হয়। এদিক থেকে ইহা খুব জটিল শাসন ব্যবস্থা। 

২. যুক্তরাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থা মন্থর ও জটিল :

যুক্তরাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় এবং আঞ্চলিক এই দুই প্রকার সরকার থাকায় সরকারের ক্রিয়া-কলাপের অনেক ক্ষেত্রেই বিলম্ব ঘটে থাকে এবং জটিলতার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, কেননা উভয়বিধ সরকারের মতামত না জেনে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। সেজন্য জরুরী সমস্যার সমাধান দ্রুত গতিতে নেওয়া অসম্ভব হয়। 

৩. ব্যয়বহুল : বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য বিভিন্ন শাসন ব্যবস্থা থাকার দরুন সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা ব্যয় সংকুল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্তরে শাসন ব্যবস্থা থাকার কারণে অসংখ্য লোক নিয়োগ করতে হয়। কেন্দ্রের অনুরূপ ব্যবস্থা প্রদেশের জন্যও নিতে হয়। ফলে ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। 

৪. সমতা বিধানের অসুবিধা :

এরূপ শাসনব্যবস্থায় অনেকগুলি রাজ্য সরকারের অস্তিত্ব থাকায় পরস্পর বিরোধী আইন প্রণীত  হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এরূপ হলে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন অসম্ভব হয়ে পড়ে। হলে দেশে নানা রকম অশান্তি গলযোগ প্রভৃতির আশংকা থাকে। শাসন কার্যও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। 

৫. দায়িত্বহীনতা :

ক্ষমতা বিভাজনের কারণে দায়িত্বহীনতা দেখা যায়। অনেক সময় এক সরকার অন্য সরকারের উপর নিজস্ব অপরাধ চাপানোর চেষ্টা করে। নিজের ভুলের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে। 

৬. দুর্বল শাসন ব্যবস্থা :

কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে শাসন ক্ষমতা বন্টিত হয়। ফলে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করার অসুবিধা হয়। মাঝে মধ্যেই সরকার সমূহের  মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে কলহ হয়। এই দুর্বলতা বিশেষভাবে প্রকাশ পায় বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে। দ্বিমত দেখা দিলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সরকারের দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। 

৭. ক্ষমতার সন্তোষজনক বন্টন:

জাতীয় ঐক্য ও আঞ্চলিক বিভিন্নতার মধ্যে সমন্বয় সাধনই সকল যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থার মূল সমস্যা। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে একদিকে যেমন যথেষ্ট কার্যক্ষম কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যবস্থা করতে হয়, তেমন অপরদিকে অঙ্গরাজ্যগুলিকে নিজেদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অবাধ বিকাশ সাধনের সুযোগ দিতে হয়। সেই উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় এবং অঙ্গরাজ্যগুলির মধ্যে কিভাবে আইন তৈরি এবং আইন কার্যকরীকরণের ক্ষমতা ভাগ করে দিতে হবে তা অবশ্যই স্থির করতে হবে। যে সাধারণ নীতির ভিত্তিতে সংবিধানের ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয় তা বেশ স্পষ্ট।

যে সকল বিষয়ে সমগ্র দেশই জড়িত অর্থাৎ সাধারণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীনে ন্যাস্ত করা হয় ;আর যে সকল বিষয়ের গুরুত্ব প্রধানত :আঞ্চলিক তা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের হাতে ন্যাস্ত করা হয়। কেন্দ্র অবশ্যই প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয়, এবং কতকগুলি অপরিহার্য অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করবে। অঙ্গরাজ্যগুলিকে অবশ্যই অন্তত :এদের নিজস্ব স্থানীয় শাসন ও শিক্ষার মত বিষয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া উচিত, সম্ভবত :কেন্দ্রের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে অঙ্গরাজ্য গুলির নিজস্ব পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থাও থাকে। ফৌজদারি আইন, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ, শ্রমও ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সাধারণ স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্বার্থ সম্পূর্ণ পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করা যায় না। এই সকল বিষয় কখনও কখনও কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে কখনও কখনও অঙ্গরাজ্য গুলির নিয়ন্ত্রণে এবং প্রায়ই কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যেরসহ এখিতয়ারে ন্যস্ত করা হয় এবং উভয়ই এ সকল বিষয়ে আইন তৈরি করতে পারে। 

 যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র এবং অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা বন্টনের জন্য দুটি উপায়ের কোন একটি অনুসরণ করা হতে পারে (১)সংবিধানে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে অবশিষ্ট ক্ষমতা অঙ্গরাজ্য গুলির হাতে ছেড়ে দেয়া হবে; অথবা (২) সংবিধানে আঞ্চলিক সরকার গুলির ক্ষমতা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নেস্ত করা যেতে পারে। সংবিধানে এইসব ক্ষমতা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এদেরকে সুনির্দিষ্ট করার মাধ্যমে ক্ষমতা সীমিত করা। সিএফ স্ট্রং এর মতে, যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানে অঙ্গরাজ্য গুলির ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করার উদ্দেশ্য হলো এই ক্ষমতা সীমিত করে কেন্দ্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ স্ট্রং এর মতের অনুসরণে একথা সাধারণভাবে বলা যায় যে, যেক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলিকে  অবশিষ্ট ক্ষমতা বেশি পরিমাণে দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য বেশি মাত্রায় বিকাশ লাভ করে। 

  আইন কার্যকরী করার ক্ষেত্রে আরও জটিল সমস্যা দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় সরকার এবং অঙ্গরাজ্য উভয়েরই নিজস্ব আদালত, পুলিশ বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন হয়। সকল যুক্তরাষ্ট্রেই এই শ্রেণীর পুলিশ বাহিনী এবং মধ্যে এবং আদালতের মধ্যে নিজ নিজ এখতিয়ার সম্পর্কে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। সাংবিধানিক উপায়ের তুলনায় বরং পারস্পরিক সদিচ্ছার মাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সকল বিরোধ মীমাংসা করতে হবে। 

৮. কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের এখতিয়ার সংরক্ষণ : 

যুক্তরাষ্ট্রে, কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা সন্তোষজনক উপায়ে বন্টন করলেই চলবে না উপরন্ত এদের স্ব-স্ব এখতিয়ার  সংরক্ষণের স্ব স্ব  ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে।আবার কেন্দ্র এবং অঙ্গরাজ্য যাতে একে অপরের সংবিধান নির্দেশিত ইখতিয়ার লংঘন করা হতে বিরত থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু সংবিধানের ভাষা দ্ব্যর্থক  ও  অস্পষ্ট হয়ে পড়ে, সেহেতু যেকোনো যুক্তরাষ্ট্রেই ক্ষমতা বন্টন সংক্রান্ত বিধানাবলির ব্যাপারে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে কতকগুলি রক্ষাকবচের সংস্থান রাখা হয়। প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ব্যাখ্যা করার জন্য এবং কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যেকার বিরোধ মীমাংসার জন্য 

একটি সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয়তঃ :সংবিধান লিখিত ও সেইসঙ্গে অবশ্যই দুষ্পরিবর্তনীয়  হতে হবে। সংবিধান সাধারণ আইনের তুলনায় উচ্চতর মর্যাদা এবং কেবল বিশেষ পদ্ধতিতেই পরিবর্তনযোগ্য হবে। অঙ্গরাজ্যগুলি  স্বাভাবিকভাবেই এরূপ  রক্ষাকবচ চাইবে। এরূপ রক্ষাকবচ না থাকলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলেই অঙ্গরাজ্যগুলির অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে এককেন্দ্রিক শাসন চাপিয়ে দিতে সমর্থ হবে। তৃতীয়তঃ সাংবিধানিক প্রশ্নে জনগণের মতামত জানার জন্য গনভোট, গণ- উদ্যোগ ইত্যাদির বিধান থাকতে পারে।  

৯. সংবিধানের ব্যাখ্যা ও সংশোধনের সুষ্ঠু পদ্ধতির ব্যবস্থা করা : যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধান ব্যাখ্যা ও সংশোধন করার সুষ্ঠু পদ্ধতির বিধান করা এক বিশেষ সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হয়। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে সংবিধান ব্যাখ্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে একটি সুপ্রিম কোর্ট। প্রতিষ্ঠা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধান কেবল সমগ্র নাগরিকের অধিকারই সংরক্ষণ করে না, উপরন্ত বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের দাবিও সংরক্ষণ করে। তাছাড়া বিভিন্ন এমনকি পরস্পর বিরোধি স্বার্থসংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্য গুলির মধ্যে সমঝোতা নিশ্চিত করাও যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানের অন্যতম উদ্দেশ্য। সুতরাং সংবিধানে ব্যাখ্যা ও পরিবর্তনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অসাধারণ গুরুত্ব লাভ করে। 

 আদালত আইন তৈরি এবং পরিবর্তন করবে বলে প্রত্যাশা করা হয় না, বরং আদালত শুধু আইন ঘোষণা করবে বলে মনে করা হয়। এ দৃষ্টিকোণ হতে আদালত প্রত্যক্ষ সালিশ মাত্র, আদালত কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষ সংবিধানের অর্থই ঘোষণা করে ;জনগণ আদালতের নিকট হতে সংবিধানের অর্থ জানার পর তা পছন্দ না করলে তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসাবে কাজ করতে পারে। তারা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তন করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানে সংশোধন পদ্ধতিতে দুটো বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

প্রথমত :সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা একমাত্র কেন্দ্র বা একমাত্র অঙ্গরাজ্য গুলির এক্তিয়ারে থাকবে না ;

দ্বিতীয়তঃ সংবিধানে সংশোধনের ক্ষমতায় কেন্দ্রীয় অঙ্গরাজ্য উভয়েরই অংশ থাকতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে কেন্দ্রীয় আইন সভাকে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করার ক্ষমতা দেওয়া হয়, কিন্তু এই প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ অঙ্গরাজ্যের সম্মতি থাকা অপরিহার্য। উপরন্তু কোন কোন যুক্তরাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের সম্মতি ব্যতীত এর কতকগুলি মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা যায় না। দৃষ্টান্ত হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে অঙ্গরাজ্য গুলির সম প্রতিনিধিত্বের অধিকারের কথা উল্লেখ করা যায়। 

১০. কেন্দ্র এবং অঙ্গরাজ্য গুলির মধ্যকার সম্পর্কের রূপদান: আদর্শগতভাবে বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্য উভয়েই সংবিধান  নির্দেশিত স্ব – স্ব এখতিয়ারের মধ্যে একে অপরের নিকট হতে স্বাধীন থেকে কাজ করে যাবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য গুলির উপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে সংবিধানেই এরূপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যে প্রজাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাছাড়া যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মন্দা এবং যোগাযোগ ও শিল্পের বিকাশের ফলে অঙ্গরাজ্য গুলির উপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অঙ্গরাজ্য গুলির যথার্থ স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হয়েছে। কারণ যুদ্ধ বা যুদ্ধের আশঙ্কা ও অর্থনৈতিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের একক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে।

যোগাযোগ ও শিল্পের অগ্রগতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রা কোন প্রদেশের বা অঞ্চলের মধ্যেই সীমিত না থেকে সমগ্র দেশেই সম্প্রসারিত হয়। আর এই কারণে নাগরিকদের কার্যকলাপের অনেক ক্ষেত্রই সাধারণ সরকারগুলির নিয়ন্ত্রণে এসে পড়ে। আরো বলা যেতে পারে,  অঙ্গরাজ্য গুলি সমাজকল্যাণ খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে কেন্দ্রের নিকট হতে আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে, ফলে অঙ্গরাজ্য গুলির উপর কেন্দ্রের কম বেশি আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। 

১১. অঙ্গরাজ্য গুলির মধ্যকার সম্পর্কের রূপদান :

 যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যেক অঙ্গরাজ্য কেবল কেন্দ্রের  হস্তক্ষেপ হতেই নহে, অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের  হস্তক্ষেপ হতেও স্বাধীন থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। এ উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানে সুনিদৃষ্ট বিধান উল্লিখিত থাকে। কিন্তু এক অঙ্গরাজ্য অপব অঙ্গরাজ্যের দ্বারা গৃহীত নীতিত ক্ষতিগ্রপ্ত বা অসন্তষ্ট হতে পারে। বর্তমান সময়ে অংগরাজ্যগুলির মধ্যকার সর্ম্পক বা বিরোধ নিয়ে আলোচনা  এবং এদের মধ্যে সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ কর হয়। এরূপ একটি প্রধান পদ্ধতি হচ্ছে নির্দৃষ্ট সময় অন্তর অন্তর অঙ্গরাজ্যগুলির প্রধান নির্বাহী কর্তাদের সম্মেলন অনুষ্ঠান।

১২. ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঙ্গরাজ্যকে বড় বড় অঙ্গরাজ্যের  

       আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দান: যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় অঙ্গরাজ্য যাতে কেন্দ্রীয় আইনসভার নিম্নকক্ষে তাদের বেশি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ নিয়ে আইন তৈরির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঙ্গরাজ্যের উপর আধিপত্য বিস্তার না করতে পারে, সেই নিশ্চয়তা প্রদানের চেষ্টা করা হয়। এই লক্ষ্যে  সাধারণত দুটি উপায় অবলম্বন করা হয় (১)যুক্তরাষ্ট্রে আইনসভার দ্বিতীয় কক্ষ থাকা অপরিহার্য না হলেও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয়। কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চ কক্ষে প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যকে সমান প্রতিনিধিত্ব দেয়া হয়; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে  এই ব্যবস্থা প্রচলিত। উপরন্ত এ সমস্ত যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় কক্ষকে প্রথম কক্ষের সমান বা প্রায় সমান ক্ষমতা দেওয়া হয়। (২) সংবিধান সংশোধন করতে হলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অনুমোদনই নয়, উপরন্তুু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঙ্গরাজ্যেরও অনুমোদন থাকতে হবে। অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ড এর ক্ষেত্রে এরুপ বিধান রয়েছে। মার্কিন সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে তিন চতুর্থাংশ অঙ্গরাজ্যের সম্মতি থাকা আবশ্যক। 

১৩. বিচ্ছিন্নতার অধিকার: যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যগুলির বিচ্ছিন্নতার অধিকার রয়েছে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। সম্ভবত: একমাত্র সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে বলা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে সবার অধিকার প্রত্যেক ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রের হাতে সংরক্ষিত  থাকবে। সে ক্ষেত্রে সংবিধানে এরূপ অধিকারের স্বীকৃতি  দেওয়া হয় নাই সেক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্য গুলির তত্ত্বগতভাবে এই অধিকার থাকতে পারেনা বলেই মনে হয়। এক্ষেত্রে  একমাত্র সংবিধান সংশোধন করেই কোন অঙ্গরাজ্যকে বৈধ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্র পরিত্যাগ করতে দেওয়া যায়। লীককের মতে, কোন যুক্তরাষ্ট্রে  সংবিধান সংশোধনের  ক্ষমতা সম্পন্ন সংস্থাই আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র  সম্পূর্ণভাবেই  ভেঙ্গে দিয়ে প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যকে উহার পূর্বতন স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে পারে। তবে, কোন যুক্তরাষ্ট্র  হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এমন কোন অঙ্গ-রাজ্যকে অস্ত্র বলে ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে নিবৃত্ত রাখা কঠিন  বলেই মনে হয়। এরূপ  পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোন সাংবিধানিক বিধানই দৃশ্যত যথেষ্ট  কার্যকর হবে না।  যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রমুখী ও কেন্দ্রবিমুখী প্রবনতাকে ছাড়িয়ে গিয়ে  সামপ্রতিককালে এতে দেখা যাচ্ছে  ভাঙ্গনের প্রবনতা। অবশ্য সব যুক্তরা ক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই যে এমনটি হচ্ছে অ নয়। তবে কোন কোন ক্ষত্রে এই ভাঙ্গনের পবনত। অবশ্য সব যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই যে এমনটি হচ্ছে তা নয়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে এই ভাঙ্গনের প্রবণতা  লক্ষ্য করা গেছে। উদাহরণ হিসাবে আমরা মালয়েশিয়ার কথা বলতে পারি। মালয়েশিয়া ১৯৬৩ সালে একটি যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে কিন্তু ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর উক্ত  যুক্তরাষ্ট্রীয়  ব‍্যবস্থা থেকে বের হয়ে যায়।

১৪. বিচ্ছিন্নতার মনোভাব : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় একজন নাগরিককে যদিও কেন্দ্রীয় ও স্বীয় প্রাদেশিক সরকারের প্রতি সমভাবে আনুগত্য প্রকাশ করতে হয়, তবুও আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষার জন্য অঙ্গ রাষ্ট্রের সরকারের প্রতি অধিক পরিমাণে আনুগত্য প্রকাশ করে। এই রকম মনোবৃত্তি হতে অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মনোভাবের জন্ম নেয়। ফলে সরকারের স্থায়িত্ব হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। বিচ্ছিন্ন হবার সুবিধা এককেন্দ্রিক সরকার থেকে যুক্তরাষ্ট্রেই অধিক। ইহা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। 

এপর্যন্ত  যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হলো। এখন এই সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করব। 

যুক্তরাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান :    

ঐক্য এবং বৈচিত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। যুক্তরাষ্ট্রে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকারের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের একটি যোগসূত্র স্থাপিত হয়। ইহা একটি রাষ্ট্রের মধ্যে কেন্দ্রাভিগামী প্রভাব (Centripetal Tendencies) এবং কেন্দ্রাতিগ প্রভাবের (Centrifugal Tendencies) মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবার উভয় নির্দেশ করে। 

১. যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ঐক্য এবং আঞ্চলিক স্বাতন্ত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে : যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত অঙ্গ রাজ্যগুলি কয়েকটি বিষয়ে সাধারণ রাষ্ট্রের সুবিধাদি ভোগ করতে চায়, অথচ তোর শাসনও রাখিতে চায়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এই সুবিধা পেয়ে থাকে। সাধারণ স্বার্থের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরণের আইন প্রণীত হয়। আবার বিশেষ আঞ্চলিক  স্বার্থের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পক্ষে প্রয়োজনীয় আইন যুক্তরাষ্ট্রে প্রণয়ন করা সম্ভব। এইভাবে ইহা জাতীয় ঐক্য এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে। যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের অধিবাসীগণ একই জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা বড় গুণ এই যে, ইহাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি নিজ নিজ বৈচিত্র ও বৈশিষ্ট্য বজায় রাখিয়াও এক বৃহত্তর রাজনৈতিক জীবনে শামিল হতে পারে। প্রত্যেক স্বাতন্ত্র ও বৈচিত্র মালায় সমৃদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে। বলা বাহুল্য একটি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ঐক্যবদ্ধ না হলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে রাজ্যগুলি দুর্বলই থেকে যেত। তাদের দুর্বলতার সুযোগে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি তাদের অধিকার কেড়ে নিতে পারে। তার ফলে রাজ্যগুলি স্বাধীন অস্তিত্ব বিনষ্ট হয়ে পড়ে। তাই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি নিজের স্বতন্ত্র অক্ষুণ্য রেখে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আত্ম প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্র গঠন করতে বিশেষ আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রের মিলন ও বিচ্ছেদের অধিকার একই সাথে ভোগ করা যায়। 

২. যুক্তরাষ্ট্রের লোকেরা আঞ্চলিক স্বাতন্ত্রে সন্তুষ্ট থাকে: বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের লোকেরা যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের আশা আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আপন আপন শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারী,এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভবপর। কেন্দ্রীয় সরকার সর্বদাই আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেনা । কারণ কেন্দ্র সরকার অপেক্ষা স্থানীয় লোকেরা তাহাদের নিজেদের শাসনব্যবস্থার পরিচালনা সম্বন্ধে অধিকতর উপযুক্ত। সেই জন্য যুক্তরাষ্ট্র বড় বড় রাষ্ট্রের অন্তর্গত অঙ্গরাজ্যের পক্ষে বিশেষ উপযোগী। উদাহরণস্বরূপ ভারতের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্যের সাথে সাথে আঞ্চলিক স্বাতন্ত্রতা রক্ষা হয়। আঞ্চলিক সরকার গুলি নিজ নিজ শাসনব্যবস্থা পরিচালনা, সম্পদ আহরণ, বিনিময়, ভোগ বন্টন, সাহিত্য সংস্কৃতি, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে চলতে পারে। প্রতিটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত হওয়ার ফলে একদিকে যেমন প্রতিটি জাতি নিজ নিজ সরকারের মাধ্যমে নিজ নিজ ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি প্রভীতির চরম বিকাশ সাধন করতে পারে অন্যদিকে তেমনি একটি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকার ফলে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সম্প্রীতি ও সহযোগিতার বন্ধন সুদৃঢ় হতে পারে। এক কথায় বলা যায় যে, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করতে সক্ষম হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা বর্তমানে অত্যধিক জনপ্রিত অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। 

৩. কেন্দ্রীয় সরকারের চাপ লাঘব:

শাসন ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বন্টিত  থাকে। এতে কেন্দ্রীয় সরকার বিপুল পরিমাণ তো থেকে অব্যাহতি পায়। ইহা প্রশাসকের জটিলতা থেকে রক্ষা করে।  কাজের চাপ লাঘব হওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির প্রতি অধিক যত্নবান হতে পারে। আঞ্চলিক শাসন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে। এককেন্দ্রিক সরকারে কেন্দ্রীয় সরকার দায়িত্ব সম্ভারে জর্জরিত হয়ে ওঠে। ফলে বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসন ও সমস্যা সমূহের সমাধান সঠিক হয় না। তাছাড়া স্থানীয় সমস্যার সমূহ স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বারাই অধিকতর সুন্দরভাবে সমাধান হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় রাজ্য সরকার গুলির উপর স্থানীয় সমস্যা সমূহ সমাধানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এইসব সমস্যা সম্পর্কে সরকার গুলি বিশেষভাবে অবহিত থাকায় সেগুলির সমাধানের জন্য দ্রুত ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। সমগ্র দেশের সব সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের উপর অর্পণ করা হলে তার পক্ষে স্থানীয় বা আঞ্চলিক সমস্যা গুলির সমাধানের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া সম্ভব হয়না। ফলে জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। 

৪. দেশাত্মবোধ:

প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ভোগ করার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে দেশপ্রেমের ভাব জাগ্রত হয়। আইন শৃঙ্খলা মান্য করাসহ ব্যক্তিবর্গ তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হন। 

৫. সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা রোধ :

ক্ষমতা কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে বন্টিত থাকার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার বা প্রাদেশিক সরকার স্বেচ্ছাচারী হতে পারেনা। একে অপরের স্বেচ্ছাচারিতার লাগাম হিসেবে কাজ করে। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অঞ্চলগতভাবে ক্ষমতার বন্টন থাকে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার স্বেচ্ছাচারী  হতে পারে না। কার্ল জে ফেডারিক বলেন, কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধকারী শক্তি হিসেবে কাজ করে ক্ষমতার এই অঞ্চলগত বন্টন ব্যবস্থা। আদালত সংবিধান বিরোধী ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ  দিয়ে তার  স্বৈরাচারিতার  পথ রোধ করতে পারে। 

৬. রাষ্ট্রের মর্যাদা বৃদ্ধি:

যুক্তরাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ও ইহার নাগরিকদের মর্যাদা বৃদ্ধি হয়। রাষ্ট্র সমবায় গঠনের মাধ্যমে কিন্তু তা হয় না। ছোট অঙ্গরাজ্যের আলাদাভাবে হয়ত কোন পরিচয়ই নেই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার জন্য সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং বিশ্ব দরবারে পরিচয় বহন করে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে এমনও অনেক প্রদেশ আছে যা হয়ত বাংলাদেশের চেয়ে কোন অংশে উন্নততর নয় কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একক হওয়ার কারণে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। 

৭. আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা :

যুক্তরাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে পাশাপাশি অবস্থিত অঞ্চলগুলি নিজেদের শুধু উন্নতিই বিধান করে না, বিরাজি ও  বিশৃংখলার অবসান ঘটাতে পারে। ইহা বিশ্ব শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হয়। 

৮. ঐক্য স্থাপন :

বিভিন্ন অঞ্চল গুলির মধ্যে ঐক্য  স্থাপন করে এবং জাতীয়তাবোধের জন্ম দেয়। জাতীয়তাবোধ ও ঐক্য যে কোনো জাতির উন্নতি ও  অগ্রগতির জন্য বিশেষ প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রধান সুবিধা হল একতাই শক্তি, যা মর্যাদা বৃদ্ধি করে। (The chief advantages of  federalism give strength, it also gives dignity.)   গেটেল বলেন, ইহা জাতীয়তাবোধ ও ঐকের প্রকাশ ঘটায়। (It enable the growing spirit  of nationality  and unity to manifest itself) 

৯.শাসনব্যবস্থা উন্নত হয় :

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় শাসন বিভাগের কাজ-বিশেষ উন্নত হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এবং আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বন্টন  হওয়াই শাসনকাজে অনেক ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয়  সরকার ভার  মুক্ত হয়ে জাতীয়  উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বুনিয়াদ দৃঢ় করবার  দিকে মনোনিবেশ করতে পারে।

১০. রাজনৈতিক শিক্ষা :

এই ব্যবস্থায় অধিক সংখ্যক লোক  শাসনব্যবস্থায় নিতে পারেন। ইহা রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য আবশ্যক। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়,এবং শাসনকার্যে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। দেশে অবাধ রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিরাজিত থাকে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক ভিত্তিতে দলের বিকাশ লাভ করে। অধ্যাপক কোরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল যে, যেসব বিষয় জাতীয় রাজনীতিতে উত্থাপিত হলে বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে তীব্রভাবে সংঘাতের সৃষ্টি করত, সেগুলি সম্পর্কে যখন প্রদেশে তাদের রাজনীতিতে আলাদাভাবে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তখন জনগণের মধ্যে সামান্য বিভেদ দেখা দেয়। এ ব্যবস্থার ফলে কোন অঞ্চলের জনগণ অন্য জনগণের স্বার্থকে এক না করে নিজের এলাকায় নিজের স্বার্থ সাধন করতে পারে। 

১১. বিপ্লবের সম্ভাবনা কম :

ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ফলে নিজেদের মধ্যে বিপ্লবের সম্ভাবনা কম থাকে। এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনী বা কোন বিদ্রোহী শ্রেণী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বহু সরকারের হাতে ক্ষমতা থাকার কারণে বিপ্লব হওয়া সম্ভব হয় না। তাছাড়া সরকারের প্রতি বৈরী মনোভাবের সম্ভাবনাও কম থাকে। 

১২. পরীক্ষা-নিরীক্ষা :

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় আঞ্চলিক ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন ও শাসন কার্য পরিচালনার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো সম্ভব। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল ভালো হলে উক্ত আইন বা শাসন নীতি সমগ্র দেশের জন্য প্রয়োগ করা যায়। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়। 

১৩. অর্থনৈতিক অগ্রগতি :

যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবাধ  বাণিজ্য যোগাযোগ ও পরিবহনের ব্যাপারে উন্নত ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও শিল্প বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক।  

 যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের সফলতার পূর্ব শর্ত  

গঠন প্রকৃতি ও কার্যাবলী আলোচনা করলে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারকে আদর্শস্থানীয়  মনে হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে কার্যকরী করা খুব কঠিন। তাই কেসি হোয়ার যথার্থই  বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার কদাচিৎ দেখা যায়, কারণ এর শর্তাবলী  বহু। (Federal government is rare because its prerequisites are many ). প্রতিটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কেন্দ্রাতীগ (Centrifugal)   এবং কেন্দ্রাভিগামী (Centripetal) এই দুই পরস্পর বিরোধী নীতি সমন্বয়ে গঠিত। অন্যভাবে বলা যায়, ঐক্যবদ্ধ হয়েও একিভূত  না হওয়ার নীতি যুক্তরাষ্ট্র গঠনের ভিত্তিভূমি। বাস্তবে ঘটছে বাস্তবসম্মতভাবে এই দুটি পরস্পর বিরোধী নীতির সমন্বয় সাধন করতে পারলেই যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সাফল্য আসবে। নিম্নে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সাফল্যের পূর্ব শর্তসমূহ আলোচনা করা হলো :

১. প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন :

ইহা যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য। প্রদেশ সমূহের স্বায়ত্তশাসন না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র গঠিত ও স্থায়ী করা যায় না। প্রদেশ সমূহ একে অপরের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকবে। প্রদেশ সমূহের  স্বায়ত্তশাসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণস্বরূপ। কেসি হুইআর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার টিকে থাকতে হলে নিজ নিজ এলাকায় অঞ্চল গুলির স্বাধীন সত্তা অপরিহার্য। 

২. অঙ্গরাজ্যগুলির সমতা:

অঙ্গরাজ্যগুলির মাঝে সীমানা, আয়তন, জনসংখ্যা ও সম্পদের ক্ষেত্রে সমতা থাকা উচিত। কারণ আয়তনের বিভিন্নতার জন্য স্বার্থের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন রকম আচরণ দেখা যায়। ফলে এক সময়ে তা ভয়ানক অসন্তুষ্টির কারণ হয়। জে.এস. মিল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এমন কোন অঙ্গ রাষ্ট্রের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয় নয় যা অন্য কোন অঙ্গ রাষ্ট্র হতে অধিক শক্তিশালী”(There should not be any one state so much more powerful than the rest as to be  capable of lying in strength with many of them). ক্ষমতার দিকেও প্রত্যেক প্রদেশ সমান হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেন্দ্রীয় তালিকার পরে অবশিষ্ট তালিকা থাকে তা প্রদেশের উপর অর্পণ করা হয়। প্রদেশগুলির যত বেশি অবশিষ্ট ক্ষমতা থাকে তা তত বেশি যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রকৃতির। সি. এফ. স্ট্রং বলেন, “স্টেটগুলির হাতে যত বেশি আবশ্যিক ক্ষমতা রয়েছে  সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রটি যার সংবিধান স্টেটগুলিকে এই রূপ আবশ্যিক ক্ষমতা প্রদান করে তত বেশি স্পষ্ট রূপেই যুক্তরাষ্ট্রীয়”। বিভিন্ন দিক থেকে প্রদেশ গুলোর সাদৃশ্য থাকা দরকার। কেসি হুইআর বলেন, বৈসাদৃশ্যের একটা সীমা আছে, চরম বৈপরিত্যের মাঝে একসাথে কাজ করার ক্ষমতা রক্ষিত হতে পারে না। ভঙ্গিভূত অঞ্চল গুলিকে একই নজরে দেখতে হবে এবং সম্পদের সমবন্টন হতে হবে। 

৩। জাতীয়তাবোধের সুদৃঢ়  বন্ধন:

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্ঘবদ্ধ রাজ্যগুলি জাতীয়তাবাদী উদ্বুদ্ধ হলে রাষ্ট্রের মধ্যে সংহতি অধিকতর বৃদ্ধি পায়। গাইছি বলেন,a body of countries…..so closely connected by locality, by history, by race or the like, as to be capable of bearing in the eyes  of their inhabitants an impress of common nationality. সুতরাং অঙ্গরাজ্যগুলির জনগণের মধ্যে এক ভাষা, এক ধর্ম, একই ধরনের ভাবধারা ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক মিলন সূত্রের প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত রাজ্যগুলি যদি জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয় তবেই তাদের মধ্যে সংহতি বা ঐক্য  সাধিত হয়। এরূপ সংহতি সাধিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে এই সম জাতীয় মনোভাব গড়ে  না উঠলে পারস্পরিক হিংসা, দ্বেষ , অমূলক সন্দেহ প্রভৃতি জাতীয় সংহতি বিনষ্ট করে যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয়। 

৪. আর্থিক সচ্ছলতা :

আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র গঠন করা অসম্ভব হয়। বিশেষত :আঞ্চলিক সরকার গুলি আর্থিক দিক থেকে স্বচ্ছল  না হলে নিজেদেরও কিছু পরিমাণ কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়ভার বহন করতে সক্ষম হয় না। এ প্রসঙ্গে কেসি হইয়ার বলেন, “উভয়  সরকার যেন আর্থিক দিক থেকে  সচ্ছল ও স্বাধীন থেকে নিজ নিজ কাজ সম্পন্ন করতে পারে তার জন্য উভয়  সরকারেরই আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকা প্রয়োজন”।প্রদেশ গুলির যদি সরকার চালানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক স্স্বচ্ছলতা না থাকে তাহলে যতগুলি রাজ্যই ফেডারেল ভুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করুক না কেন এবং যেভাবেই যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্র রচিত হোক না কেন কার্যত: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার গঠন ও সম্ভব। 

৫. লিখিত ও দুষ্পরিবর্তনীয়  শাসনতন্ত্র:

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার সফলতার জন্য সংবিধানের প্রাধান্য থাকা একান্ত প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মাঝে ক্ষমতা শাসনতন্ত্রের বিধান অনুসারে বন্টিত হয়। তাই শাসনতন্ত্রের প্রাধান্য একান্ত প্রয়োজন। সংবিধানই যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নাগরিক ও অঙ্গরাজ্য গুলির স্বার্থ রক্ষার বিরাট রক্ষাকবচ। সুতরাং ইহা দুষ্পরিবর্তণীয় হওয়াই প্রয়োজন। কারণ দুষ্পরিবর্তনীয় না হলে সরকার গুলি নিজেদের সামান্য প্রয়োজনে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য অগ্রসর হবে। ডাইসির মতে, “সংবিধান অবশ্যই লিখিত হতে হবে”। কেসি হুয়ারের মতে,  সংবিধান লিখিত বা অলিখিত হোক না কেন এর সার্বভৌমত্ব থাকতেই হবে 

ডাইসি বলেন,    “Federalism  means the distribution of the force of the state among a members of coordinate bodies,originating in and controlled by the constitution”. 

 ৬. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা :

যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। বিচার বিভাগের প্রাধান্য না থাকলে ইহা প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে না

কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকার সমূহের মধ্যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রাধান্য দেখা দিলে বা শাসনতন্ত্র সংক্রান্ত কোনো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলে বিচার বিভাগ ইহার আইনগত ব্যাখ্যা প্রদান করে। 

৭. আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল : 

এর সফলতার জন্য সরকার ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আইন মান্য করার মনোভাব গড়ে না উঠলে যুক্তরাষ্ট্র কায়েম হতে পারে না। 

৮. রাজনৈতিক উদ্দেশ্য :

যুক্তরাষ্ট্র গঠনের জন্য সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকা প্রয়োজন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য না থাকলে জাতীয় ঐক্য  গড়ে ওঠে না। জাতীয় ঐক্য না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী হতে পারে না। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সাদৃশ্য থাকা আবশ্যক। যুক্তরাষ্ট্র গঠন করার পূর্বে রাজনৈতিক সাদৃশ্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সাদৃশ্য থাকা আবশ্যক। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল প্রায় এক ও অভিন্ন। 

৯. যোগ্য নেতৃত্ব :

সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতৃত্ব আবশ্যক। জাতীয় ঐক্য ও আঞ্চলিক স্বার্থের সমন্বয় সাধন করে একটি দেশকে পরিচালনার জন্য পরিপূর্ণভাবে যোগ্য নেতা আবশ্যক। যোগ্য নেতৃত্বের বলে বিভিন্ন প্রকার সংকীর্ণতা ও মতানৈক্য দূরীভূত হয় এবং জনগণের মধ্যে একত্রিত হবার ইচ্ছা জাগ্রত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ত ১৩টি কলোনি রাষ্ট্রসমবায়  থেকে যেত এবং কোন সময় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠিত হতো না-  যদি না ওয়াশিংটন, জেফারসন, অ্যাডামস, হ্যামিলটন, ও বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এর মত যোগ্য নেতার তখন আবির্ভাব না হত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রিল ক্রাইস্টের ভাষায় The sentiment of unity is the index of a common National mind. 

১০. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা :

কেন্দ্র ও প্রদেশ সমূহে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অবশ্য প্রয়োজন। শুধু কেন্দ্রে থাকলেই হবে না প্রদেশ সমূহেও গণতান্ত্রিক শাসন বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার ব্যবস্থায় অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। সুগঠিত দল আবশ্যক।  বিরোধী দলের অস্তিত্বকে মেনে নিতে হবে। 

১১. ভৌগোলিক সান্নিধ্যতা : 

অঙ্গীভূত অঞ্চলগুলির অবস্থান খুব দূরে হওয়া উচিত নয়। কারণ এতে সার্বিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারকে বহু প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। জনগণ দূরে অবস্থান করলে জাতীয় ঐক্য অর্জন করা দুরূহ হয়। প্রদেশ গুলি পাহাড়, পর্বত, নদী বা অন্য কিছুর দ্বারা বিচ্ছিন্ন না হলে  সুবিধা হয়। ভৌগলিক সান্নিধ্যতা বা সংলগ্নতা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতায় সহায়ক হয়। গিল  ক্রাইস্ট বলেন, “Distance leads to   carelessness or  callousness  on the part of both Central and local governments.

১৩. সাহিত্য সংস্কৃতি ও ভাষা :

অনেকে মনে করেন ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি একই হলে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে। 

১৩. শিক্ষা :

রাষ্ট্রকে সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনার জন্য শিক্ষা- দীক্ষা, রাজনৈতিক চেতনা, কর্ম দক্ষতা প্রভৃতির ব্যাপক প্রসার আবশ্যক। উভয় প্রকার সরকারের প্রতি যদি নাগরিক বৃন্দ আনুগত্যতা প্রকাশ ও অধিকার আদায়ের শিক্ষা লাভ না করে তাহলে সুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। 

১৪. মনোভাব :

যুক্তরাষ্ট্র গঠনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রীয় মনোভাব। যত প্রকার বিধি-বিধানই আরোপ করা হোক না কেন মনোভাব না থাকলে হতে পারে না। জনগণের মাঝে যদি মিলনের ইচ্ছায় না থাকে তাহলে শত আয়োজন ব্যর্থ হতে বাধ্য। মিলন হবে কিন্তু একত্রে মিশে যাবে না। মিশে গেলে তা হবে এককেন্দ্রিক সরকার। যদি অঙ্গরাজ্য গুলি মনোভাব পোষণ না করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র গঠনের কোন প্রশ্নই আসে না। এ প্রসঙ্গে কেসি হুইয়ার বলেন, “যদি সংশ্লিষ্ট জনসমষ্টি অথবা রাষ্ট্র সমূহ কোন স্বাধীন সরকারের অধীনস্থ হতে আগ্রহী না হয় সাধারণ সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাই তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার গঠনের প্রথম শর্তটিই পূরণ করেনি”

যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ :

 আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনেকেই অভিমত পোষণ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাদের মতে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা ও  অদূর  ভবিষ্যতে এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হবে। কিন্তু কেসি হুইয়ার প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ এই অভিমত পোষণ করেন যে, কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গরাজ্য গুলির গুরুত্ব, আত্ম সচেতনতা ও আত্ম প্রতিষ্ঠার ইচ্ছাও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্যান্টন গুলির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। 

  যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উপর্যুক্ত দুটি মতেরই পেছনে যে কিছুটা সত্যতা আছে তা অস্বীকার করা যায় না। এ কথা সত্য যে, বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য ছাড়া যেমন কোন সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান  সম্ভব নয় তেমনিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত বিভিন্ন জাতীয় জনসমাজের নিজ নিজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের স্বাধীনতা এবং বিশেষ বিশেষ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার অধিকারেরও স্বীকৃতি প্রয়োজন। এই বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেই কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য আসতে পারে। বড় বড় দেশগুলোর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা নিশ্চয়ই কাম্য  এবং সেই জন্য বড় বড় দেশগুলো স্বত: প্রবৃত্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো গ্রহণ করেছে। গতিশীল সমাজে অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সরকারের কাঠামোর পরিবর্তন হয় এবং সেই জন্যই অনেক ক্ষেত্রেই আমরা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার গুলিতে কেন্দ্রিকতার প্রবাল ঝোঁক দেখতে পাই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো যে সমস্ত রাষ্ট্র গঠন করেছে তারা কাঠামোর  দিক হতে কখনোই এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার কারন নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত অঙ্গরাজ্যগুলির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং তার সাথে মৈত্রির  ভাব থাকে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মূল রাষ্ট্রগুলি নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থের সাথে দেশের সামগ্রিক স্বার্থের এবং সাধারণ সার্থকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করে ততক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে দিয়ে এক কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করার সম্ভাবনা আদৌ নেই। তবে যদি কোন দেশে এক নায়ক তন্ত্রের সৃষ্টি হয় এবং স্বৈরাচারী একনায়ক যদি সমগ্র দেশটিকে  দেশটিকে সম্পূর্ণভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনতে চান তবে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের ক্ষেত্রে এক কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা গঠিত হওয়া স্বাভাবিক। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এই আশঙ্কা থাকে। পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অপেক্ষা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংশয় প্রকাশের কোন সঙ্গত কারণ নেই। 

উপসংহার 

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে এযাবৎ যা আলোচনা পর্যালোচনা করা হয়েছে তা থেকে বলা যায় যে নানা রকম সমস্যা থাকা সত্তেও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা বিশ্বের বৃহৎ এবং শক্তিশালী দেশ সমূহ যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তার কারণ এরূপ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে নিজ নিজ স্বাতন্ত্র গঠনের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করতে পারে। বহু জাতি অধ্যুষিত রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রয়োজনীয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার এমন একটি রাজনৈতিক কৌশল যেখানে জাতীয় সংহতি ও অঙ্গরাজ্যের সমন্বয় সাধন সম্ভব। 

মো. মুকুল হায়দার

সহযোগী অধ্যাপক,

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ,যশোর।

Categories
Honors 2nd Year Honors 1st Year Honors 3rd Year Honors 4th Year Master's Final Year Others

জুলাই বিপ্লব ২০২৪ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

‘জুলাই বিপ্লব’— বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এটি একটি জাতির গণজাগরণ ও সংগ্রামের মহাকাব্যিক চিত্র। বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতির রক্তাক্ত অধ্যায় ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান। এ আন্দোলন ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। শহীদদের রক্তে রাঙানো রাজপথ, সাহসী স্লোগানে মুখরিত ছাত্র-জনতা এবং এক নতুন সূর্যের প্রত্যাশা— এই বিপ্লবের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ।

‘জুলাই বিপ্লব’ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই বিপ্লবের পটভূমি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ, যা কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে উত্তপ্ত রূপ লাভ করে। পরবর্তীকালে একটি বৈষম্যবিরোধী গণজাগরণে রূপ নেয়, যা ফ্যাসিস্ট নেতৃত্বাধীন ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটায়।  ২০১৮ সালে সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দিলেও; ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে। এই রায়ের ফলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা এবং ১০ শতাংশ জেলা কোটা পুনর্বহাল হয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার করে। ফলে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠনের নেতৃত্বে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকালে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মত প্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, যা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল। এছাড়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষা ও চাকরির সংকট এবং মূল্যস্ফীতি জনগণের অসন্তোষকে আরও তীব্র করে তোলে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সরকার এটি দমন করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে। এ ঘটনার পর আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। সরকারের দমননীতি ক্রমেই গণহত্যায় রূপ নেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১,৫৮১ জন শহীদ হন, যার মধ্যে ১২৭ জন শিশু ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খসড়া তালিকায় শহীদের সংখ্যা ৮৩৪, এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ১,৪০০ পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার কারফিউ জারি করে এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, কিন্তু এটি জনরোষকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ২১ জুলাই বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করে ও সরকারি চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে। ২২ জুলাই এই বিষয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনের ফলে কোটা সংস্কার হলেও এরই ধারাবাহিকতায় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় ।

আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর এবং সেনাবাহিনীর দ্বৈত ভূমিকার মধ্যে ৫ আগস্ট ২০২৪ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এই ঘটনার পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে।

জুলাই বিপ্লব শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এটি প্রমাণ করে যে, জনগণের সম্মিলিত শক্তি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে পারে।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল বিস্তর। এই বিপ্লব থেকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল বহুমুখী এবং গভীর। জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যেখানে থাকবে আইনের শাসন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামো। জনগণ প্রত্যাশা করেছিল যে, তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে, জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠিত হবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে এই বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল সমাজে বিদ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করা। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। জনগণ আশা করেছিল যে, কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ নিশ্চিত হবে এবং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি, এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল সমাজের প্রচলিত অচলায়তন ভেঙে নতুন একটি পরিবর্তনের সূচনা করা, যেখানে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হবে এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

জনগণ প্রত্যাশা করেছিল যে, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে। এছাড়া, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সত্য প্রকাশের নিশ্চয়তা ছিল এই আন্দোলনের অন্যতম দাবি। জনগণ আশা করেছিল যে, এই শহীদদের ত্যাগ স্বীকৃত হবে এবং তাদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া, শহীদদের স্মরণে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগও জনগণের প্রত্যাশার অংশ ছিল। বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব শাসনব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছিল। আন্দোলনের ফলে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের আশা ছিল যে, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল। জুলাই বিপ্লব ছিল ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ফল। জনগণ আশা করেছিল যে, এই ঐক্য একটি সম্প্রীতিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়ক হবে, যেখানে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে কাজ করবে।

জুলাই বিপ্লব ২০২৪ থেকে প্রাপ্তি

জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান। অনিশ্চিত, ঝুঁকিপূর্ণ ও দুঃসাহসী সেই সময়ে ৫ আগস্ট ২০২৪-এ তীব্র গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। ৮ আগস্ট ২০২৪-এ নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক সংকট নিরসন এবং অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। এই সরকার দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ।

৫ অগাস্ট পরবর্তী সম্ভাব্য নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে না দেওয়াই বর্তমান সরকারের আরও একটি বড় অর্জন। এদের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ হলো, বিশৃঙ্খল ও বিধ্বস্ত ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। আওয়ামী লীগ আমলের লণ্ডভণ্ড অবস্থা সামাল দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১১টি কমিশন গঠন করেছেন। এই কমিশনগুলো ইতিমধ্যে তাদের রিপোর্ট প্রদান করেছেন। এদের রিপোর্টের ভিত্তিতে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যেটা একটি আশা জাগানিয়া ঘটনা।

১৫ জানুয়ারি ২০২৫-এ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪’-এর ৮৩৪ জন শহীদের নামের গেজেট প্রকাশ করা হয়। এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ভবন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাদের ত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখার প্রয়াস। রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ এবং ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

জুলাই বিপ্লব ছাত্র-জনতার ঐক্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে জেন-জেড প্রজন্ম এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তাদের সাহস ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়। ‘বাংলা ব্লকেড’ এবং “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার” স্লোগানগুলো জনমনে গভীর প্রভাব ফেলে। নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।

এই বিপ্লব জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এবং স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থার দাবিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। আন্দোলনের ফলে রাষ্ট্র ও সমাজে সত্য বলার নিশ্চয়তার গুরুত্ব উঠে এসেছে।

এই আন্দোলন বাংলাদেশের সামাজিক মানচিত্রে একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। তরুণ সমাজের শক্তি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের সক্ষমতা স্পষ্ট হয়েছে।

ধর্মীয় সম্প্রীতির ইতিবাচক দৃষ্টান্তও দেখা গেছে, যেখানে মাদ্রাসার ছাত্ররা দুর্বৃত্তের হাত থেকে মন্দির পাহারা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের রক্ষায় এগিয়ে এসেছে।

বিপ্লব পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলেও, আনুষ্ঠানিক ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশে বিলম্ব এবং রাজনৈতিক ঐক্যের অভাবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪-এ ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়, যদিও পরে এটি ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ নামে একটি নতুন কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হয়। এই ঘোষণাপত্রে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দিকনির্দেশনা থাকার কথা ছিল।

শিক্ষা খাতে সংস্কারের জন্য এখনো কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি, যা আন্দোলনের একটি মূল দাবি ছিল। শিক্ষা খাতের সংস্কারে কমিশন গঠন না হওয়া নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। জুলাই গণহত্যার বিচারের ধীরগতি এবং বিচার এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। শহীদ ও আহতদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, এবং অর্থ পাচারের মতো সমস্যা মোকাবিলায় এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বাঁক বদলের ঘটনা। এটি কেবল কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হয়ে একটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়, যা দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, এবং অর্থনৈতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের পথ দেখায়। জুলাই বিপ্লব, বাংলাদেশের জনগণের সাহস, ঐক্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এটি স্বৈরাচারের পতন, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, এবং জনগণের, বিশেষ করে তরুণ সমাজের, ক্ষমতাকে নতুনভাবে উন্মোচন করেছে। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বের ক্ষমতা প্রমাণ করেছে। এই বিপ্লব থেকে জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, যেখানে সকলের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। এটি যদিও অনেক প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে, তবুও একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, দুর্নীতিমুক্ত এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার পথ এখনো দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। শিক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্কার, গণহত্যার বিচার, এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ বাকি। এই আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম এবং আসন্ন নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার গুরুদায়িত্ব রয়েছে। এই বিপ্লবের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করছে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয় তার উপর; সেইসাথে জনগণের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা এবং আগামী দিনগুলোতে এর অর্জিত পরিবর্তনগুলোকে কতটা টেকসই করা যায় তার ওপর। এই বিপ্লবের ফলাফলকে টিকিয়ে রাখতে সংস্কার ও স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। এই বিপ্লব আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যা যুগ যুগ ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এক ইতিহাস হয়ে থাকবে আর শহীদদের  বিরোচিত আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যেকোনো অন্যায়, অপশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার, লড়াই করার প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। 

জুলাই বিপ্লব পিডিএফ

মো. মুকুল হায়দার

*সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর,

সহায়ক তথ্যপঞ্জি

  • আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ‘জুলাই মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০২৫
  • মো. মতিউর রহমান, ‘জুলাই বিপ্লব’ মিফতা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০২৪
  • আজাদ খান ‘ছাত্র-জনতার ২৪ এর বিপ্লব’ চারু সাহিত্য অঙ্গন, ঢাকা, ২০২৫
  • ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘সংস্কৃতি’, মে ২০২৫