মহামতি বুদ্ধদেব
বুদ্ধদেব যখন বৃদ্ধ তখন এক তরুণ সাগরেদ বুদ্ধদেবের কাছে আসতো, উদ্দেশ্য ছিল গুরুর মৃত্যুর পর গুরুর মত করে খানকা তৈরী করে সেখানে আয়ের একটা ব্যবস্থা করবে এবং বাকি দিনগুলি আরামে কাটিয়ে দিবে। কয়েক বছর যাতায়াত করেও যখন কাঙ্খিত জ্ঞান লাভ করতে পারল না তখন মন স্থির করলো, যখন কেউ থাকবেনা তখন গুরুকে উচিত শিক্ষা দিবে।
যেই চিন্তা সেই কাজ। সুযোগ বুঝে একদিন গুরুর সামনে উত্তেজিতাবস্তায় হাজির হয়ে খুব বকাবকি গালিগালাজ করছে, বেটা বুড়া এত বছরে কিছুই শেখাও নাই বলে শুরু করে যা মুখে আসছে তা একতরফাভাবে বলে যাচ্ছে, বলতে বলতে যখন ক্লান্ত তখন গুরু বলছেন আর কিছু বলবে? একথা বলার সাথে সাথে আবার বকা, আবার গালি।
থেমে যাওয়ার পর বুদ্ধদেব বললেন, তোমাকে একটা প্রশ্ন করি ? রেগে গিয়ে আর একটু বকার পর বললো কর কী প্রশ্ন করবা! তখন গুরু বললেন ধর, তোমার কাছে একটা জিনিস আছে , তুমি জিনিসটা কাউকে দিতে চাইলে অথচ সে নিল না, তাহলে জিনিসটা কার থাকবে? জবাবে তরুন মতলববাজ সাগরেদ বললো এতটুকু বোঝনা? যার জিনিস তার থাকবে। গুরু বললেন ঠিকতো? তরুণ বললো ঠিক! গুরু এবার বললেন, এতক্ষন তুমি আমাকে যা দিতে চাইলে তার কিছুই আমি নিলাম না!
কাউকে আঘাত করলে সে আঘাত নিজের কাছে বুমেরাং-এর মত ফেরত আসতে পারে । তাই মমতা দিলে মমতা আসবে।শুভ কামনা করলে নিজের শুভ হবে। অভিশাপ দিলে নিজের লাগতে পারে। অন্যদিকে বলা যায় আপনার ভালো কাজে অন্যের অর্থহীন সমালোচনায় কান দিলে আপনি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন না।
মহামানব ঈসা আঃ
একদিন কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে মহামানব ঈসা আঃ হেঁটে যাচ্ছেন, যেতে যেতে পথিমধ্যে একটি লোক তাঁকে গালি দিল। তখন তিনি পাশে দাঁড়িয়ে তার জন্য প্রার্থনা করলেন এবং আবার রওনা দিলেন। কিছুদুর যাওয়ার পর আরেকটি লোক তাকে গালি দিল। তিনি তার জন্যও পাশে দাঁড়িয়ে প্রর্থনা করলেন। তখন সঙ্গীরা তাঁকে প্রশ্ন করলেন,ওরা গালি দিল অথচ আপনি ওদের জন্য প্রার্থনা করলেন ? জবাবে মহামানব ঈসা আঃ বললেন দেখ, ওদের কাছে যা আছে ওরা তাই দিয়েছে, আমার কাছে যা আছে আমি তাই দিয়েছি।
মহামানবেরা সব সময় ভালো আচরণ দিয়েই মন্দ আচরণের জবাব দিয়ে থাকেন।
মহামানব হযরত মোহাম্মদ (সঃ)
এক রাতে এক ঈহুদি হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর বাড়িতে মেহমান হলো । মোহাম্মদ (সঃ) মেহমানদারির কোন ঘাটতি রাখলেন না। সুন্দর কম্বলটি মেহমানকে দিলেন । মেহমানের মতলব ছিল মোহাম্মদ (সঃ) কে কষ্ট দিবে। রাতে উঠে কম্বলটিতে প্রাকৃতিক কাজ সেরে সে চলে গেল। অনেক দূরে যাওয়ার পরে মনে হলো তাইতো, তরবারি ফেলে রেখে এসেছি, ভাবলো কীভাবে আনবো যে অপরাধ করেছি তাতো ক্ষমা পাবার নয়, তবে যেহেতু মোহাম্মদ (সঃ) ভালো মানুষ তাই আমাকে মেরে ফেলবে না বটে তবে চড় থাপ্পড় তো দুই একটা মারবেই। ভাবতে ভাবতে তরবারি নিতে ফিরে চললো।
এদিকে মোহাম্মদ (সঃ) ফজরের নামাজের সময় উঠে দেখেন মেহমান কম্বল নষ্ট করে চলে গেছেন। উনি নিজ হাতে তা পরিস্কার করলেন। এরমধ্যে মেহমান ফিরে এসে দুরু দুরু বক্ষে মোহাম্মদ (সঃ)-এর সামনে হাজির। সে কিছু বলে উঠার আগেই মহামানব হযরত মোহাম্মদ (সঃ) বললেন , আহারে কত কষ্টই না পেয়েছ! তুমি আমাকে ডাকতে পারতে! তোমার তরবারি ফেলে রেখে গিয়েছ , এই নাও তোমার তরবারি! লোকটি মোহাম্মদ (সঃ) এর আচরণে মুগ্ধ হয়ে তাঁর অনুসারী হয়ে গেলেন।
একজন ব্যক্তি মহামানব হযরত মোহাম্মদ (সঃ)কে জিজ্ঞাসা করলেন ধর্ম কী ? জবাবে রসূল সঃ বললেন , ধর্ম হচ্ছে সদাচরণ।
মহাবীর আলেকজান্ডার
মহাবীর আলেকজান্ডার মাত্র ৩৩ বছর বেঁচে ছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি তিনটি উইশ করে যান। ১। আমার শব যাত্রার সময় খালি দুই হাত যেন কফিনের বাইরে বের করা থাকে। ২। যাত্রার পথে সোনাদানা ছিটিযে দিবেন। এবং ৩। আমার লাশ বহন করবে ডাক্তাররা।
তিনি কেন এ কথা বললেন তা জানতে চাইলে জবাবে বললেন, আমার হাত খালি থাকার অর্থ হলো পৃথিবীর মানুষ দেখুক যে, এত দেশ, এত সম্পদ আমার অধীনে থাকা সত্তে¡ও আমি খালি হাতে চলে যাচ্ছি। কিছুই আমার নিয়ে যাওয়ার সামর্থ নেই। কিছুই আমার না। সোনাদানা এইজন্য ছিটাতে বলেছি যে, মানুষ এটাও দেখুক যে, হিরা জহরত মনি মুক্তা কোন সম্পদই মানুষকে ধরে রাখতে পারে না। এসবই অর্থহীন। আর ডাক্তারদের লাশ বহন করতে বলেছি এইজন্য যে, ডাক্তাররা জানুক যে, কোন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার সামর্থ তাদের নেই।
ক্ষমতা , সম্পদ, পদ-পদবী সবই ক্ষণিকের। আলেকজান্ডারের গুরুর গুরুর গুরু, সক্রেটিসের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘নো দাইসেলফ’ বা নিজেকে জানো। এই নিজেকে জানতে যে সময় দিয়েছে বা জানতে পেরেছে ,সে-ই প্রকৃত সুখের সন্ধান পেয়েছে।
মো. মুকুল হায়দার
*সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর,
2 replies on “মহামানবদের ছোট্ট গল্প”
ছোট গল্পঃ হলেও এর মাঝে রয়েছে বড় শিক্ষা।
ধন্যবাদ আপনাকে sir,শিক্ষণীয় শিরোনাম এর জন্যে